আন-নাবা : একটি দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী তাফসীর
সুরা আন-নাবা (سورة النبأ) মক্কী সূরা, আয়াত সংখ্যা ৪০। কুরআনের ৩০তম পারায় অবস্থিত এই সূরাটি কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা এবং আল্লাহ তাআলার মহাশক্তির সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করে। “নাবা” শব্দের অর্থ হলো মহাসংবাদ বা মহান সংবাদ। এখানে সেই মহান সংবাদ বলতে কিয়ামতের দিন, পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবনের অনিবার্য সত্যকে বোঝানো হয়েছে।
১. “তারা কী বিষয়ে পরস্পরে প্রশ্ন করছে?”
সূরার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা প্রশ্নের মাধ্যমে মানুষের মানসিকতা উন্মোচন করেন। মক্কার কাফিররা কিয়ামত ও পুনরুত্থানকে অসম্ভব বলে মনে করত। তারা এই বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। আল্লাহ বলেন, তারা যে মহান সংবাদ নিয়ে মতবিরোধ করছে, তা অচিরেই তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এখানে শিক্ষা হলো—মানুষ আল্লাহর বাণী নিয়ে সন্দেহ করলে প্রকৃতি ও বাস্তবতা একদিন তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবেই।
২. পৃথিবী ও সৃষ্টিজগত: কিয়ামতের প্রমাণ
আল্লাহ তাআলা কয়েকটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক নিদর্শন তুলে ধরেছেন:
পৃথিবীকে বিছানা বানানো
পর্বতকে খুঁটির মতো স্থাপন করা
মানুষকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করা
রাতকে বিশ্রামের জন্য এবং দিনকে জীবিকার জন্য নির্ধারণ করা
আকাশকে সুদৃঢ় ছাদ হিসেবে গঠন করা
সূর্যকে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ বানানো
মেঘ থেকে পানি বর্ষণ করে ফসল উৎপাদন
এই সমস্ত নিদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহ বোঝাতে চান—যিনি এত নিখুঁতভাবে বিশ্বজগত পরিচালনা করতে পারেন, তাঁর জন্য মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করা মোটেও কঠিন নয়।
এটি কুরআনের এক গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি:
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি পুনরায় সৃষ্টি করতে অবশ্যই সক্ষম।
৩. কিয়ামতের দৃশ্যপট
সূরার মধ্যভাগে কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে:
শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে
মানুষ দলে দলে উপস্থিত হবে
আকাশ বিদীর্ণ হবে
পাহাড় চলমান হয়ে মরীচিকার মতো হয়ে যাবে
এই আয়াতগুলো মানুষের হৃদয়ে ভীতি ও জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। দুনিয়ার শক্তি, সম্পদ ও অহংকার সেদিন কোনো কাজে আসবে না।
৪. জাহান্নাম: অপরাধীদের আবাস
জাহান্নামকে “ঘাঁটি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করেছে, তাদের জন্য সেখানে রয়েছে:
জ্বলন্ত আগুন
ফুটন্ত পানি
পুঁজ ও দুর্গন্ধযুক্ত পানীয়
কঠোর ও দীর্ঘ শাস্তি
এখানে আল্লাহ সুবিচারের ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ বিনা কারণে শাস্তি পাবে না, আবার অপরাধ করেও কেউ রেহাই পাবে না।
৫. জান্নাত: মুত্তাকীদের জন্য মহাপুরস্কার
এরপর আল্লাহ জান্নাতের চিত্র তুলে ধরেছেন:
সুন্দর বাগান ও আঙুরের বাগিচা
সমবয়সী সুশীলা সঙ্গিনী
পরিপূর্ণ পানপাত্র
শান্তি ও নিরাপত্তা
কোনো অসার কথা বা মিথ্যার শব্দ নেই
জান্নাতের এই বর্ণনা মানবজীবনের সর্বোচ্চ সফলতার প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে শুধু ভীতি নয়, বরং অনন্ত আশার দিকও রয়েছে।
৬. আল্লাহর মহিমা ও মানুষের নীরবতা
সেদিন রূহ ও ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। কেউ কথা বলবে না, শুধু আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে-ই কথা বলতে পারবে।
এটি আল্লাহর পরম কর্তৃত্ব ও মহিমার চূড়ান্ত প্রকাশ।
৭. মানুষের আক্ষেপ
অপরাধীরা বলবে:
“হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!”
এই একটি বাক্য পুরো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনুশোচনার প্রতিচ্ছবি। দুনিয়ায় আল্লাহর আদেশ অমান্য করে যারা আত্মতুষ্টিতে ছিল, সেদিন তারাই সবচেয়ে বেশি হতাশ হবে।
—
সূরাটির মূল বার্তা
১. কিয়ামত ও পরকাল অবশ্যম্ভাবী সত্য
২. আল্লাহর সৃষ্টিজগৎই পুনরুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ
৩. দুনিয়ার জীবন পরীক্ষামাত্র
৪. প্রতিটি কর্মের হিসাব হবেই
৫. জান্নাত ও জাহান্নাম কল্পকাহিনি নয়, বাস্তব গন্তব্য
৬. সফলতা কেবল তাকওয়া ও আনুগত্যে
—
উপসংহার:
সুরা আন-নাবা মানুষের চিন্তাকে নাড়া দেয়, আত্মাকে জাগ্রত করে এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনের দিকে আহ্বান জানায়। এটি আমাদের শেখায় যে, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। অতএব, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র বানায়।
Leave a Reply